শুরুর কথা মহিষাসুর বরপ্রাপ্ত হওয়ার পর, স্বর্গ মর্ত্য পাতাল তল করে দিলেন। চতুর্দিকে "ত্রাহি মধুসূদন" অবস্থা। এহেন অবস্থায় একদিন মহিষাসুর ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে রাস্তা দিয়ে মাথা নীচু করে ছুটে আসছেন,হঠাৎ দেখলেন রাস্তার মাঝে এক পরমাসুন্দরী কন্যা। হতচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কে তুমি?" তিনি বললেন, "অহম দুর্গে..." এ গল্প নিশ্চয়ই আপনারা অনেকেই শুনেছেন। এর থেকে কে কি শিক্ষা নিয়েছেন জানিনা। তবে কিছু মানুষের শিক্ষা সহজে পরিলক্ষিত হয়:
শিক্ষা১: কথা নেই বার্তা নেই মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়লেই হলো। মহিষাসুর হন বা মহিষ-সুলভ স্পিডিং গাড়ি, আপনি দেখে, থমকে, “এ ক্যা রে!” বলতে বাধ্য।
দ্বিতীয় শিক্ষা দিয়েছিল বাঙালির খুব মনের কাছের একজন মানুষ – ইন্দ্রনাথ। কোন ইন্দ্রনাথ? মাছ ধরতে গিয়ে এক বুক জলে নেমে ডিঙি নৌকা ঠেলতে ঠেলতে সমবয়সী বন্ধুকে যে বলতে পেরেছিল, “মরতে তো একদিন হবেই ভাই…” সেই ইন্দ্র। শ্রীকান্তের ইন্দ্র।
শিক্ষা ২: মরতে একদিন হবেই। বিছানায় শুয়ে গলে পচে মরার থেকে মাঝরাস্তায় গাড়ির নীচে চাপা পড়ে সটকে যাওয়া অনেক adventurous।
তৃতীয় এবং শেষ শিক্ষা দিয়েছেন বুদ্ধদেব। না। বসু বা ভট্টাচার্য নন। স্বয়ং বুদ্ধ-দেব। তিনি বলেছিলেন মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে। সংসারে থাকবেন কিন্তু পাকে বাঁধা পড়বেন না। মাঝ খান দিয়ে হাঁটবেন।
শিক্ষা ৩: সেটা জীবনের মাঝ বরাবর হোক বা রাস্তার। সোজা কথা, ধারের দিকে যাবেন না।
মূল বক্তব্য
অতএব,এই সব শিক্ষায় শিক্ষিত দুর্গা এবং ইন্দ্ররা বুদ্ধদেবের কথা মেনে, মাঝ রাস্তায় দুমদাম দাঁড়িয়ে পড়েন। আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন চালান। তাতে ওনাদের কি……!? ওনারা মাঝ রাস্তায় দড়াম করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে যাবেন। পূজা স্থান হলে তো কথাই নেই।
কেউ যদি তাঁর পরীক্ষা নিতে চান বা প্রমাণ করতে চান যে তিনি নেই তাহলে সড়াৎ করে রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে পেন্নাম ঠুকতে লাগবেন। যদি তিনি থাকেন তবে মহিষরা বিরক্ত/আতঙ্কিত/বিহ্বল ইত্যাদি হয়ে, “এ ক্যা রে..” বলে ব্রেক টানবে আর তিনি যদি সেই মুহূর্তে অন্যদিকে মন-টন দেন তাহলে পেন্নাম ঠুকতে ঠুকতেই উক্ত মধ্যপন্থী, ইন্দ্রনাথ হয়ে যাবেন।
মানে যাই হোক, এঁরা বাংলা ও বাঙালির মনের কাছাকাছি থাকতে বদ্ধপরিকর। আর ধরা যাক, তিনি ইন্দ্রনাথ হতে পারলেন না, (দুঃখ পাবেন না। সকলেই তো লিজেন্ড হয়না মশাই) তাহলে তিনি চোখের সামনে গাড়ির ড্রাইভারকে ইন্দ্রনাথ হতে দেখবেন পাবলিকের হাতে। মনে রাখবেন শ্রীকান্ত হওয়াটাও একইরকম গুরুত্বপূর্ণ। যুগে যুগে শ্রীকান্তদের নিয়েই নভেল লেখা হয়। ইন্দ্ররা শুধু স্কুলের সিলেবাসে “থাকে মুখ ঢাকি..”
অভিজ্ঞতা
কোথা থেকে শুরু করবো জানিনা।
দিন কয়েক আগে ভর সন্ধ্যেবেলা এক ভদ্রমহিলা অন্ধকার রাস্তায় বাবা তারকনাথের স্তব করছিলেন। পুজোর পর, কালীপুজোর আগে – বাবা সেদিন সন্ধ্যেবেলা খালিই ছিলেন। ফলে মহিষ-সুলভ একখানি duster প্রচন্ড জোরে ব্রেক টেনে ভদ্রমহিলার বাবা-মা-শ্বশুর-শাশুড়ি উদ্ধার করছেন। ভদ্রমহিলা তখন “শিব-নেত্র”…. শুনতে পেলেন কিনা জানিনা। কিন্তু আমি “কাকিমা একটু ধারে দাঁড়ান না..” বলতেই তিনি খেঁকিয়ে মেকিয়ে তেড়ে এলেন। (মানুষকে মিষ্টি কথা বলার দিন নেই মশাই!!!)
এ সমস্যা একেবারেই gender ভিত্তিক নয়। এক ভদ্রলোক প্রত্যহ eastern metropolitan bypass এর মাঝে দাঁড়িয়ে মা তারার/বাবা তারকনাথের/শ্রীকৃষ্ণের বা যা হোক একটা কারুর প্রতি ভক্তি নিবেদন করেন। “দাদু সরে দাঁড়িয়ে করুন…” বললে বছর সত্তরের ভদ্রলোক বাবা-মা-জ্ঞাতি-গুষ্টি একত্রে উদ্ধার করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। (পুজোয় বাধা পড়লে পরমহংসও খিস্তি করতেন, ঐটে এখানে বলার কথা নয়)
আরেক বছর পঁয়ত্রিশ-চল্লিশের যুগল আছেন। বেচারারা বোধকরি বাড়িতে ঝগড়ার সুযোগ পাননা। তাই তাঁরা প্রায়শঃ তাঁদের ঠিক বাড়ির বাইরের রাস্তায় গ্যারেজে গাড়ি ঢোকাবার বা গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করবার সময় ঝগড়া করেন। এহেন সময়ে যিনি গাড়িতে নেই তিনি রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে এই কম্মটি সাধন করেন। স্ত্রী গাড়ি বার করেন, স্বামী গাড়ি ব্যাক করে ঢোকান। মানে পুরো clock-work। যাঁদের এত মিল তাঁরা ওমন মারামারি কাটাকাটি ফাটাফাটি কেন করেন, সেইটা ভাবতে গিয়ে আবার আমিই একদিন প্রায় ভদ্রমহিলার ঘাড়ে উঠে পড়েছিলাম। যা হোক, ঠিক সময় ব্রেক কষায় আমি ভগবানের ভালোবাসা লাভে বঞ্চিত হয়েছি।
পরিশেষ
গাড়ি যেহেতু আপনার বা স্টিয়ারিং যেহেতু আপনার হাতে ফলে সাবধান আপনাকেই হতে হবে। আপনি বরং বাম বা ডান পন্থী হয়ে উঠুন। তবে অতি বাম বা অতি ডান না হওয়াই শ্রেয়।
বি.দ্র: জানেন কিনা জানিনা, গাড়ির আয়তন এবং দামের সঙ্গে মারের পরিমাণ খানিকটা intelligence এবং creativityর মতো, দাম বেশি হলে একটা level অব্দি মারের পরিমাণ বাড়ে। মানে activa 5Gর চালক (যেমন আমি) একসিডেন্ট করলে enfield এর চালকের থেকে কম মার/গাল খাবো। কিন্তু তা বলে porscheর চালক i10-এর থেকে বেশি খাবেন না। হয়তো খাবেনই না। লোকে হেঁ হেঁ করে ছেড়ে দেবে। না হলে “being human” এর মতো brands তৈরী হয় না।